নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রামের সম্ভ্রান্ত এক ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ ইলিয়াস আজ কানাডায় বসবাস করছেন, তবে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা থেকে পালিয়ে। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি আধুনিক আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলা—সেই স্বপ্ন আজ রাজনৈতিক দুর্নীতি, পুলিশের চাঁদাবাজি এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নির্মম শিকার।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া ইলিয়াস ছিলেন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ উদ্যোক্তা। তাঁর বাবা মোহাম্মদ ইউনুস ছিলেন দক্ষিণ খুলশি ও চাঁন্দগাঁও এলাকায় ভবন মালিক, যেখান থেকে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা ভাড়া আসত। পরিবারটির ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে রয়েছে একাধিক দোকান, প্লট এবং একটি সফল ট্রাভেল এজেন্সি। সেই আর্থিক সক্ষমতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে ইলিয়াস গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন একটি অভিনব রিয়েল এস্টেট প্রকল্প—যেখানে থাকবে সাততলা আবাসিক ফ্ল্যাট সহ ডে-কেয়ার, জিম, ও সুপারমার্কেট সুবিধা।
২০১৬ সালে ইলিয়াস প্রকল্প শুরু করেন। কিন্তু উন্নয়নের স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার মোঃ শফিকুল ইসলামের চাঁদাবাজি দাবি ও হুমকির মুখে। কমিশনারের দাবি ছিল বিনামূল্যে ফ্ল্যাট, ইলিয়াস তা দিতে প্রত্যাখ্যান করলে শুরু হয় ভয়াবহ নির্যাতন, হামলা, এবং নির্মাণ বাধা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে ২০১৭ সালের ইলিয়াস তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে যেতে বাধ্য হন।
ইলিয়াস ২০২২ সালে আবার দেশে ফিরে প্রকল্প চালু করতে চান। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এবার শুধু ওয়ার্ড কমিশনার নয়, সরাসরি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিসিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন চাঁদা দাবি করেন। দাবি প্রত্যাখ্যান করায় ইলিয়াস নির্মাণস্থলে বারবার পুলিশি হয়রানির শিকার হন।
অবশেষে ২০২২ সালের অক্টোবরে তিনি এই দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করেন। এর ফল হয় ভয়াবহ। ইলিয়াসকে অপহরণ করে মারধর করা হয়, মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং জমির দলিল হস্তান্তর চাওয়া হয়। বাবাকে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হয় তার মুক্তির জন্য।
পরবর্তীতে, ইলিয়াসের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার ভয়ে এবং জীবন রক্ষার্থে তিনি ও তাঁর স্ত্রী ২০২৩ সালে কানাডায় যান। কানাডায় গিয়ে ইলিয়াস শরণার্থী আবেদন করেন । তার আগেই তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে ইলিয়াসের পরিবারের অবস্থা এখনো বিপর্যস্ত। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কমিশনার শফিকুল ইসলাম তাঁদের চাঁন্দগাঁওয়ের বাড়ি দখল করে নেন। মার্চে ইলিয়াসের বাবাকে অপহরণ করে মারধর ও লুট করা হয়। ২০২৫ সালে বাবার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা দিয়ে তাঁকে কারাবন্দি করা হয়। তার মা, ভাইবোনরা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন।
এসব ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, শুধু পুলিশ নয়—রাজনৈতিক নেতাও তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর। এদিকে অভিযুক্ত ডিসিপি মোহাম্মদ আলী হোসেন পদোন্নতি পেয়ে খুলনায় বদলি হয়েছেন এবং ওয়ার্ড কমিশনার প্রভাব রক্ষা করে চলেছেন।
ইলিয়াস বলেন, “আমি শুধু একটি স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলাম—চট্টগ্রামকে আধুনিক ও বাসযোগ্য করতে। কিন্তু দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি আমাকে সবকিছু হারাতে বাধ্য করেছে। এখন আমার একটাই আশা—মানবাধিকার সমুন্নত একটি দেশে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে পারা।”
মোহাম্মদ ইলিয়াসের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি ভঙ্গুর সিস্টেমের প্রতিফলন। যেখানে সৎ উদ্যোক্তা হওয়া মানে রাজনৈতিক ও পুলিশি প্রতিহিংসার শিকার হওয়া। এখন কানাডার আদালত ও প্রশাসনের উপর নির্ভর করছে—এই নির্যাতিত মানুষটিকে সুরক্ষা দেবে কিনা একটি মানবিক আশ্রয় দিয়ে।
Leave a Reply