1. admin@news24hour.net : admin :
আলুর ফলন ভালো হলেও কৃষকের মুখে হাসির বদলে আহাজারি - নিউজ ২৪ আওয়ার
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৫:১২ পূর্বাহ্ন

আলুর ফলন ভালো হলেও কৃষকের মুখে হাসির বদলে আহাজারি

  • প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ, ২০২৫

নিজস্ব প্রতিবেদক : রংপুর মহানগরীসহ এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় চলতি মৌসুমে আলুর রেকর্ড পরিমাণ চাষ হয়েছে। তবে এবার দাম না থাকায় লাভের বদলে লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। এমন পরিস্থিতি বজায় থাকলে এবার খেতের আলু খেতেই পড়ে থাকবে-এমনটা শঙ্কা করছেন অনেকেই। এ ছাড়াও কোল্ড স্টোরেজে ভাড়া বৃদ্ধি করায় চাষিরা বিপাকে পড়েছেন।

চাষিরা বলেন, চলতি মৌসুমে আলুর আবাদ রেকর্ড পরিমাণ হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে মাথায় হাত পড়েছে। কারণ বর্তমানে প্রতিকেজি ১২-১৩ টাকা দরে বিক্রি করছেন। অথচ কেজিতে খরচ পড়েছে ২০ টাকার মতো। এতে লাভের আশা তো দূরের কথা, চাষের দেনা পরিশোধ নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেক চাষি।

আলু চাষিরা জানান, এবার বীজ ও সারের দাম বেশি হওয়ায় প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ১৯-২০ টাকা। সেই আলু ১১-১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে লোকসানে পড়তে হচ্ছে তাদের। অথচ খুচরা বাজারে এখনো প্রতিকেজি ১৮-২৫ টাকায় বিক্রি হয়। তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। মাঝখানে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ঠিকই লাভবান হচ্ছেন। এ অবস্থায় হাজারো কৃষককে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর মহানগরীসহ জেলায় চলতি মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমি। অতীতের রেকর্ড ভেঙে চাষ হয়েছে ৬২ হাজার ২৮০ হেক্টরে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত আবাদ হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। তবে তা ২০ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে।

অন্যদিকে রংপুর ছাড়াও রংপুর অঞ্চলের নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট জেলায় এবার আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল এক লাখ ৬০২ হেক্টর জমিতে। সেখানে আবাদ হয়েছে এক লাখ ১৯ হাজার ৮৩৯ হেক্টর।

চাষিরা জানান, গত মৌসুমে প্রতিকেজি আলুর দাম উঠেছিল ৭০-৮০ টাকা পর্যন্ত। তাতে কমবেশি সবাই লাভবান হয়েছেন। সেই আশায় এবার বেশি জমিতে আবাদ করেছেন। এবার মৌসুমের শুরুতেই প্রতিকেজি বিক্রি হয় ৯০ টাকায়। এখন মাঠে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ টাকায়।

এদিকে খুচরা বাজারে আলুর দাম ১৮-২৫ হলেও চাষিদের কাছ থেকে তা ১২-১৩ টাকা কেজিতে কিনে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্থভোগীরা।

চাষিরা আরও জানান, এক দোন (২৪ শতক) জমিতে আলু চাষ করতে ২৩০ কেজি বীজ ব্যবহার হয়েছে, যার বাজারমূল্য ২৫ হাজার ৩০০ টাকা। এ ছাড়া সার, কীটনাশক, স্প্রে, শ্রমিক, সেচ ও জমি ভাড়া মিলিয়ে মোট খরচ হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী ফলন বিক্রি করে এ খরচ উঠবে না বলে তারা জানান।

বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর এলাকার চাষি হাফিজার রহমান জানান, তিনি ৩৬ শতক জমিতে আলু চাষ করেছেন। গত বছর নিজের বীজ আলু থাকায় অন্যান্য খরচ বাবদ প্রায় ২৮ হাজার ব্যয় হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। কিছু আলু বিক্রি করেছেন তাতে আশানুরূপ লাভ হয়নি। বাকি আলু উত্তোলন করলেও তেমন লাভ হবে না। যদি কোল্ড স্টোরেজ রাখেন তাতেও সমস্যা, কারণ এবার ভাড়া বৃদ্ধি হয়েছে।

বদরগঞ্জ উপজেলার শামপুর বৈকন্ঠপুর এলাকার চাষি লুৎফর রহমান বলেন, এবার ফলন ভালো হয়েছে। দাম না থাকায় কোল্ড স্টোরেজে রাখব। কিন্তু ভাড়া বৃদ্ধি করায় বিপাকে পড়েছি। তারপরও ভালো দামের আশায় স্টোরেজে রাখব।

রংপুর সদরের লাহেড়ীরহাট এলাকার চাষি আরজ আলী জানান, তিনি ১৩ দোন (২৪ শতকে এক দোন) জমিতে আলু চাষ করেছেন। প্রতি দোনে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তিনি ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকা লোন করে এই আলুর চাষ করেন। এবার আলুর ব্যাপক চাষ হওয়ায় দাম বর্তমানে কম। দাম বাড়বে কি না তাও সন্দিহান।

তিনি বলেন, দাম না থাকলে আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখব। কিন্তু এবার প্রতিকেজি ৮ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। অনেক কোল্ড স্টোরেজে অগ্রিম টাকা চাওয়া হচ্ছে। সঙ্গে আলু উত্তোলন খরচ তো আছে। তবে জায়গা পাব কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কারণ দাম কম থাকায় অনেকেই আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখবে।

রংপুর নগরীর জলকরিয়া এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, অনেকেই আলু নিয়ে চিন্তিত। আলুর যদি দাম বেশি থাকতো তাহলে একটু ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম। তবে সরকার যদি বিদেশে আলু রপ্তানি করে তাহলে চাষিদের জন্য ভালো হতো।

পীরগাছা উপজেলার চাষি শহিদুল ইসলাম ও ফুল মিয়া জানান, বেশি লাভের আশায় ঋণ করে দুজনে দুই একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। এখন লাভের আশা তো দূরের কথা, ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

আরেক চাষি জাহাঙ্গীর আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই আলু হিমাগারে রাখতে গেলেও খরচ বেশি। কারণ হিমাগারের খরচ এবার বাড়ানো হয়েছে। সেখানেও রেখেও যদি পরে দাম না পাই সে ভয়ে এখনই বিক্রি করে দিতে হচ্ছে।

রংপুর সিটি বাজার পাইকারি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আক্কাছ আলী জানান, তারা সরাসরি চাষির কাছ থেকে আলু কেনেন না। তারা পাইকারি হাট থেকে কেনেন। সেখান থেকে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে দুই-তিন টাকা লাভে বিক্রি করেন। তবে এটা সত্য, এবার কৃষকরা আলুর ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। কারণ বাজারে দাম কম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আফজাল হোসেন বলেন, রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আলু চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতিবছর রংপুর অঞ্চলে আলু চাহিদার চেয়ে উদ্বৃত্ত থাকে। উৎপাদিত আলু দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বাদে বিদেশেও রপ্তানি হয়ে থাকে।

তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগ সব সময় চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছে। চাষিরা কোল্ড স্টোরেজের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে আলু সংরক্ষণ করলে এখন যে বাজারমূল্য তার চেয়ে বেশি পাবে বলে তিনি আশা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২২ নিউজ ২৪ আওয়ার
Theme Customized By Shakil IT Park