নিজস্ব প্রতিবেদক : মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুকুর ব্যক্তিগত অর্থে ভরাটের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফায়েকুজ্জামান বাবুলের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুমন মিয়ার বিরুদ্ধেও চেয়ারম্যানের সাথে যোগসাজশের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
কালিকাপুর ইউনিয়নের ৪৬ নম্বর চরনাচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে প্রায় ৪০ শতাংশ জমির ওপর থাকা পুকুরটি বিদ্যালয়ের সম্পত্তি। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত এক সপ্তাহ ধরে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে পুকুরটি ভরাট করা হয়েছে। এতে চেয়ারম্যানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরও সহযোগিতা ছিল বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সরকারি একটি প্রকল্পের মাধ্যমে পুকুরটি ভরাটের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান। তবে প্রকল্পটি অনুমোদন না হওয়ায় পরে নিজের অর্থে পুকুরটি ভরাট করেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, ভবিষ্যতে সরকারি অর্থ থেকে এই ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা করা হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে পুকুরটি ভরাট করায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এলাকাবাসী জানান, বিদ্যালয়ের পুকুরটির পানি দীর্ঘদিন ধরে গোসলসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে আসছিলেন তারা। এ ছাড়া আশপাশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে আগুন নেভানোর কাজেও পুকুরটির পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। পুকুরটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে চেয়ারম্যান পুকুরটি ভরাট করেছেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হচ্ছে। পুকুর ভরাটের ঘটনায় এক ইউপি সদস্যও জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।
মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, পুকুরটি ভরাটের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তা না হলে একজন ইউপি চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে বিদ্যালয়ের পুকুর ভরাট করবেন কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভরাট করা পুকুরের বালু অপসারণের দাবি জানান তিনি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফায়েকুজ্জামান বাবুল বলেন, সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে পুকুরটি ভরাটের কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় জনস্বার্থে তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে পুকুরটি ভরাট করেছেন। এতে প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তাই এ নিয়ে কারও আপত্তি থাকার কথা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুমন মিয়া বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান ফায়েকুজ্জামান বাবুলই পুকুরটি ভরাট করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তিনিই ভালো বলতে পারবেন। পুকুর ভরাটের কোনো অনুমতিপত্র তার কাছে নেই। তবে ভরাট করা জায়গাটি বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ বড় করার কাজে ব্যবহার করা হবে। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতেই পুকুরটি ভরাট করতে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকিয়া সুলতানা বলেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসককেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদারীপুরের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলে এলাহী বলেন, কোনো শিক্ষক নিজের সিদ্ধান্তে বিদ্যালয়ের পুকুর ভরাট করতে পারেন না। বিষয়টি তদন্তের জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের মাদারীপুরের উপপরিচালক জেসমিন আক্তার বানু বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান কোনোভাবেই বিদ্যালয়ের পুকুর ভরাট করতে পারেন না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী পুকুর বা জলাশয়ের স্বাভাবিক চরিত্র পরিবর্তন কিংবা তা ভরাট করা নিষিদ্ধ। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়েও ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর বা জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন ও ভরাটের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।
Leave a Reply