ক্যামেরা তাঁকে কখনোই টানে না, বরং এড়িয়ে যেতেই তিনি ভালোবাসেন। মুখের সামনে মাইক্রোফোন– তাতে ভীষণ অ্যালার্জি তাঁর। ভিড়ের মধ্যে পরিচিত মুখ দেখলে বড়জোর চোখের ইশারায় সাড়া দেওয়া। আজ প্রায় ১০ বছর হয়ে গেল, মুস্তাফিজুর রহমানের মুখে এখনও সেই লাজুকতা, চাঞ্চল্যতার স্পর্শ। তিনি সুকৌশলেই কাছে ভিড়তে দেননি। এদিন যেমন আবুধাবির টিম হোটেল থেকে দুবাই যাওয়ার সময় বাসে উঠলেন দাঁড়িয়ে থাকা ক্যামেরার ভিড় বাঁচিয়ে অনেকটা নিঃশব্দে। আসলে মুস্তাফিজ এমনই, নিজের কাজটি নীরবে করে যান কোনো প্রশংসা-স্তুতির আশা না করেই। অনেকটা বাড়ির সেই অভিভাবকের মতো, বটবৃক্ষ যে ছায়া দিতে জানে।
সেদিন আফগানিস্তানকে হারানো ম্যাচটিতেই যেমন। ১১ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন নাসুম আহমেদ। ৩১ বলে ৫২ রান করে তানজিদ তামিম নির্বাচিত হয়েছেন দলের মুখপাত্র হিসেবে, সোহানের রানআউট করার প্রশংসা সবার মুখে। কিন্তু ফেসবুকের দেয়াল থেকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ– কোথাও নেই মুস্তাফিজ। লোকমুখে যা একটু, তা-ও ওই ১৯তম ওভারে নুর আহমেদেকে রানআউট মিস করা নিয়ে। অথচ মুখচোরা এই মুস্তাফিজই কিন্তু ছিলেন জয়ের অন্যতম চরিত্র। মোহাম্মদ নবির মতো অভিজ্ঞ ব্যাটারকে যেমন ফিরিয়েছেন তিনি, তেমনি রশিদ খানকেও রীতিমতো ফাঁদ পেতে শিকার করেছেন। গজনফারকেও উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেছেন। ২৮ রান খরচ হয়েছে তাঁর ৩ উইকেট নিতে।
হাজারো খবরের ভিড়ে অনেকেই খেয়াল করেননি যে এদিন নীরবে একটি রেকর্ডেও নাম লিখিয়েছেন মুস্তাফিজ। দেশের হয়ে টি২০তে এখন তাঁর উইকেট শিকারের সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪৬। আর তিনটি উইকেট নিলেই তিনি শীর্ষে থাকা সাকিব আল হাসানকে স্পর্শ করবেন। এদিন আবুধাবিতে একটি মাইলফলক অবশ্য এরই মধ্যে ছুঁয়ে নিয়েছেন। এই যে তিনি ১৪৬ উইকেট শিকার করেছেন ১১৬ ম্যাচে, তার মধ্যে ১০০ উইকেট নিয়েছেন তিনি জয়ী ম্যাচগুলোতে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যেসব ম্যাচে জিতেছে, সেসব ম্যাচে মোট ১০০টি উইকেট নিয়েছেন একা তিনিই। সাগরের দিকহারা নাবিকের ‘অ্যালব্রেটস পাখি’ এই মুস্তাফিজ। তাঁকে শুধু ব্যবহার করার কৌশলটা জানতে হয়। একটা সময় অধিনায়ক মাশরাফি তাঁকে ‘ফিজ’ বানিয়েছিলেন, সাকিবের কাছেও তিনি ছিলেন সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। এখন লিটন দাসের ‘বটবৃক্ষ’ মুস্তাফিজুর রহমান।
শুধু পারফরম্যান্সেই নয়, দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞজনও তিনি। খেলে নিয়েছেন ১১৬ টি২০। সেখানে লিটনের ঝুলিতে ১১৩টি। কাছাকাছি সময়ে অভিষেক হলেও মুস্তাফিজের আইপিএল খেলার স্নায়ুক্ষয়ী সব অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশ্বের তাবড় সব ব্যাটারকে আউট করার স্মৃতি রয়েছে। তাঁর সেসব অতীতকে ড্রেসিংরুম খুব সম্মান করে। সে কারণে ইনিংসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তাঁর হাতেই বল তুলে দেন লিটন। আফগানদের বিপক্ষেই যেমন পাওয়ার প্লেতে একটি ওভার করিয়েছিলেন তিনি মুস্তাফিজকে দিয়ে। মাঝে একটি ওভার করিয়ে উইকেট পাওয়ার পর তাঁকে রেখে দিয়েছিলেন ১৭ আর ১৯তম ডেথ ওভারের জন্য।
গায়ে না মাখলেও একটি অপবাদ তাঁকে দিয়ে থাকেন অনেকে। তিনি নাকি দেশের মাটিতেই বীর, বিদেশে গেলে সেভাবে উইকেট পান না। এদিন আফগান ম্যাচের পর কিন্তু সেই রেকর্ডও ভেঙে ফেলেছেন। এ মুহূর্তে দেশের হয়ে বিদেশের মাটিতে এই ফরম্যাটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির নাম মুস্তাফিজুর রহমান। ৬৫ ইনিংসে ৮৩ উইকেট শিকার করেছেন তিনি, যেখানে সাকিবের ছিল ৭৪ ইনিংসে ৮০ উইকেট। আসলে এভাবেই নীরবে-নিঃশব্দে নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে রাখতেই তাঁর ভালো লাগে। তাঁকে ঘিরে গল্প লেখা হোক– এটি তিনিও চান না। তার পরও গল্প যেন তিনিই কীভাবে লিখে ফেলেন।
Leave a Reply